ঢাকাসোমবার , ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  1. আমতলী
  2. কলাবাড়ি
  3. কান্দি
  4. কাশিয়ানী
  5. কুশলা
  6. কোটালীপাড়া
  7. খেলা
  8. গোপালগঞ্জ
  9. গোপালগঞ্জ সদর
  10. জাতীয়
  11. টুঙ্গিপাড়া
  12. পিঞ্জুরী
  13. পৌরসভা
  14. বঙ্গবন্ধু
  15. বান্ধাবাড়ি
আজকের সর্বশেষ খবর

কোটালীপাড়ায় পারিবারিক পুষ্টিবাগানে কৃষকের হাসি

মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল
নভেম্বর ১৭, ২০২৫ ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

কোটালীপাড়ার গ্রামীণ জনপদে পারিবারিক পুষ্টি বাগানের মাধ্যমে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।
বাড়ির অব্যবহৃত আঙিনা, পতিত জায়গায় ফুটে উঠছে শাক-সবজির সবুজ সমারোহ। উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ` `পারিবারিক পুষ্টিবাগান‘ নামে পরিচিত স্বল্প পরিসরের চাষাবাদ অনেক কৃষকের জন্য পুষ্টি ও আয়ের নিরাপদ উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বছর বাগান থেকে তাজা শাকসবজি সংগ্রহ করে পরিবারগুলো একদিকে নিজেদের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে বাড়তি ফসল বিক্রি করে পাচ্ছে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ।
কৃষকদের সাথে কথা বলে ও উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেড় শতাংশ জমির একটি পুষ্টিবাগান থেকে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে গড়ে ৫৫০ কেজি শাকসবজি। প্রতি কেজি ৩০ টাকা করে হলেও বছর শেষে এসব ফসলের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। উৎপাদন খরচ মাত্র ৩ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ায় বছরে প্রায় ১৩ হাজার টাকার মতো লাভ পাচ্ছেন কৃষকরা। শুধু তাই নয়, এসব বাগানের সবজি প্রতিদিন পরিবারের খাবারের বড় অংশ পূরণ করছে। কোনো কোনো পরিবার বলছে তাদের দৈনিক শাকসবজির প্রয়োজনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই আসে এই বাগান থেকে।
বান্ধাবাড়ী ইউনিয়নের হরিনাহাটি গ্রামের কৃষক ইসমাইল হাওলাদার বলেন, কৃষি অফিসের সহায়তায় ছয় বছর ধরে এই বাগান করে আসছেন। সারাবছর শাকসবজি ফলাই। নিজেরা খাই, আর বাড়তি সবজি বিক্রি করি। বছরে ৫-৬ হাজার টাকা বাড়তি আয় হয়। অল্প জমিতেও কত রকম ফসল ফলানো যায় এটা না করলে বোঝা যেত না।
কুশলা ইউনিয়নের মান্দ্রা চৌরখুলি গ্রামের কৃষক মিলন শেখ বলেন, পারিবারিক পুষ্টিবাগান মূলত উত্তম কৃষি চর্চার অংশ। আমরা এখানে একদমই রাসায়নিক সার ব্যবহার করি না। গরুর গোবর, পাতাপচা সার ও জৈব সার ব্যবহার করি। পোকামাকড় দমনে ব্যবহার করি বিভিন্ন ধরনের জৈব বালাইনাশক আর ফাঁদ। তাই এ বাগানের সবজি খেতে যেমন ভালো লাগে, তেমনি স্বাস্থ্যের জন্যও নিরাপদ। কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা নিয়মিত আমাদের বাগানের খোঁজখবর নেন। প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
হিরণ ইউনিয়নের মাঝবাড়ি গ্রামের কৃষক মাসুদ দাড়িয়া বলেন, আমার বাগানে উৎপাদিত সবজি একেবারেই বিষমুক্ত। তাই বাজারে এগুলোর চাহিদা বেশি। অন্য সবজির চেয়ে একটু বেশি দামে বিক্রি করতে পারি।
সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পারিবারিক পুষ্টিবাগান ঘুরে দেখা গেছে, শুধু অর্থনৈতিক লাভ বা পুষ্টি পূরণই নয়, কোটালীপাড়ার কৃষকদের জীবনযাত্রায় এনেছে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারগুলো এখন স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দিকে ঝুঁকছে, কমছে বাজারনির্ভরতা, বাড়ছে নিজের উৎপাদিত নিরাপদ খাবারের প্রতি আস্থা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মুক্তা মণ্ডল বলেন, পারিবারিক পুষ্টিবাগানের মূল উদ্দেশ্য হলো বছরে বারো মাস তাজা, নিরাপদ ও পুষ্টিকর সবজি সরবরাহ নিশ্চিত করা। এটি পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি পূরণ করে। পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকমুক্ত চাষাবাদ হওয়ায় এসব সবজি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ।
তিনি আরও বলেন, এই চাষাবাদ পরিবেশবান্ধব। জৈব পদ্ধতি অনুসরণ করায় পরিবেশ দূষণ কমে, মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং কৃষকের উৎপাদন পদ্ধতি হয় আরও টেকসই।
কোটালীপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দোলন চন্দ্র রায় বলেন, পারিবারিক পুষ্টিবাগানের লক্ষ্য শুধু শাকসবজি উৎপাদন নয়; এটি আসলে একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা। এখানে কৃষক পরিবার নিজেরা পুষ্টিকর খাদ্য পায়, একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি হয়। তিনি জানান, চলতি অর্থ বছরে উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকায় মোট ৩৭১টি পুষ্টিবাগান স্থাপন করা হয়েছে। কৃষকদের ১৩ প্রকার শাক-সবজির বীজ, জৈব সার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে যাতে কৃষকেরা দক্ষতার সাথে বাগান পরিচালনা করতে পারে। গত ৬ বছর ধরে কোটালীপাড়ায় এ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তা দোলন বলেন, আগে অনেক পরিবার তাদের আঙিনার জমি ফেলে রাখত। এখন সেই জমিই তাদের পুষ্টি ও অর্থের উৎস। সারাবছর এখানে লালশাক, ডাটাশাক, পাটশাক, পুইশাক, বারবটি, শসা, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, করলা, ঢেঁড়শ, টমেটোসহ ১৩টির মতো সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। পারিবারিক পুষ্টিবাগান তাই এখন শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং গ্রামের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের একটি বাস্তব মডেল।