মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন–২০২৬কে সামনে রেখে গোপালগঞ্জ জেলায় শান্তি, শৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সুসংগঠিত, পেশাদার ও কার্যকর নিরাপত্তা বলয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, নাশকতা, গুজব ছড়ানো কিংবা ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টির অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করতে যৌথ বাহিনী দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থানে রয়েছে।
জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ যৌথ বাহিনীর পরিকল্পিত ও পেশাদার কম্বিং অপারেশন অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টহল কার্যক্রম জোরদার করায় জেলাজুড়ে দৃশ্যমান নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ও স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সমন্বিত টহল কার্যক্রমের ফলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতায় জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রধান সড়ক, প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নিবিড় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। জেলা পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন বানচালের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত হতে যাওয়া সম্ভাব্য প্রিজাইডিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার অংশ হিসেবে আয়োজিত মতবিনিময় সভাগুলোতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সরাসরি অংশগ্রহণ করছে। এসব সভায় নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের আস্থা প্রদান করে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশ পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা হবে।
সভায় প্রিজাইডিং অফিসারদের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সরকারি নির্বাচনী সামগ্রী সংরক্ষণ, মোবাইল ফোন ব্যবহারে সতর্কতা, সাংবাদিকদের পরিচয় যাচাই সাপেক্ষে কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি প্রদান, নিজ নিজ ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, প্রয়োজনে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সর্বদা সহায়তায় প্রস্তুত থাকলেও কোনো কোনো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে সামান্য সময় লাগতে পারে—সে ক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারী সকল প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় জেলা রিটার্নিং অফিসার জানান, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন সম্মিলিতভাবে গোপালগঞ্জবাসীকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। তবে জনগণের সহযোগিতা ছাড়া কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব নয়।”
সভায় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, গুজব, অসত্য কিংবা আংশিক সত্য প্রচার করে যেন কোনোভাবেই জনমনে ভীতি বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়। সাংবাদিকদের “দেশের আয়না” হিসেবে উল্লেখ করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রার্থীদের প্রতিও বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত না করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ঘটনাকে অযথা সেনসেশনালাইজ না করার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে। নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে বলেও সভায় স্পষ্ট করা হয়।
সভায় আরও জানানো হয়, সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করছে।
এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “এই দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের সুযোগ নেই। অনৈতিক কার্যক্রম বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কোটালীপাড়ার ঘাঘর বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “এবার যেভাবে সেনাবাহিনী, পুলিশ আর প্রশাসন একসঙ্গে মাঠে আছে, তাতে আমরা অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করছি। আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবার পরিবেশ অনেক শান্ত মনে হচ্ছে।”
প্রার্থীদের প্রতি এ সময় অনুরোধ জানানো হয়, কোনো ধরনের অনুরোধ, উপরোধ বা সুপারিশের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না ফেলতে। সভায় উল্লেখ করা হয়, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
এদিকে, জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিতভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, আচরণবিধি লঙ্ঘনে জরিমানা আদায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর টহল দলের অংশগ্রহণ, সাধারণ জনগণের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় এবং ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহ দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সার্বিকভাবে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গোপালগঞ্জ জেলায় একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে জেলা প্রশাসন ও গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করছে। নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম কঠোর ও কার্যকরভাবে অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

