গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের মতামত, ভিন্নমত এবং বিকল্প পথের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো হয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে তখনই, যখন সেখানে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সক্রিয় থাকে। প্রতিপক্ষ হলো সেই শক্তি, যা শাসকগোষ্ঠীকে সীমার মধ্যে রাখে, জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করায় এবং জনস্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিতে বাধ্য করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে একমুখী রাজনৈতিক বাস্তবতা বিরাজ করছে। যেখানে বিকল্প কণ্ঠস্বরগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে, বিরোধী মতকে শত্রু মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেবল গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করছে না, বরং জনগণের স্বার্থকেও উপেক্ষিত করছে।
একটি এলাকায় যদি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল সক্রিয় থাকে, তবে সেখানে সাধারণ মানুষের চেয়ে নেতাকর্মীদের চাহিদাই গুরুত্ব পায়। উন্নয়ন তখন হয়ে ওঠে লোক দেখানো, প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয় না। সড়ক, স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষাখাতের উন্নয়নে স্বচ্ছতা হারিয়ে যায়। অথচ প্রতিপক্ষ রাজনীতি সক্রিয় থাকলে শাসকগোষ্ঠীকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। তখন তারা নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয় জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষ থাকলেই শাসনব্যবস্থা হয়ে ওঠে গণমুখী।
বর্তমান সময়ে একাধিক রাজনৈতিক দলের সক্রিয় হয়ে ওঠা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে শুধু দল বাড়লেই হবে না; দলগুলোকে হতে হবে নীতিনিষ্ঠ, জনগণের স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা সম্পন্ন। যদি প্রতিপক্ষ কেবল ক্ষমতা দখল বা ব্যক্তিগত আক্রমণকে রাজনীতির হাতিয়ার বানায়, তবে সেটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে বরং দুর্বল করবে। প্রতিপক্ষতা হওয়া উচিত ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ইতিবাচক প্রতিযোগিতা। তখনই রাজনীতিতে গড়ে উঠবে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
আমাদের দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। শাসক দল মনে করে বিরোধী দল মানেই ষড়যন্ত্রকারী, আর বিরোধী দল মনে করে শাসক মানেই দমনকারী। এই মানসিকতা পরিবর্তন জরুরি। প্রতিপক্ষ থাকা মানেই শত্রু নয়; বরং তারা হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম চালিকা শক্তি।
আরেকটি গুরুতর বিষয় হলো রাজনীতি ও ব্যক্তিগত আয়ের সম্পর্ক। অনেক সময় দেখা যায়, রাজনীতিকদের নিজস্ব কোনো পেশা বা বৈধ আয়-উৎস থাকে না। ফলে রাজনীতি হয়ে দাঁড়ায় তাদের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম। এর ফলে জনগণের উন্নয়নের অর্থ লুটপাটের শিকার হয়, দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। অথচ প্রকৃত রাজনীতিক হবেন সেই ব্যক্তি, যিনি নিজস্ব সততা, পেশা ও আয়ের স্বচ্ছতার কারণে মানুষের আস্থা অর্জন করবেন। আমরা কাউকে “বড় নেতা” বলি, কিন্তু তার নৈতিক অবস্থান বা আয়ের উৎস কতটা সৎ—এ প্রশ্ন আমরা সচরাচর করি না। অথচ সেখানেই লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের দুর্বলতার মূল কারণ।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো আমাদের নীরবতা। আমরা অনেকেই সব কিছু দেখেও চুপ থাকি, প্রতিবাদ করি না। এই নীরবতা সুযোগ সন্ধানীদের উৎসাহিত করে। তারা মনে করে তারাই জনগণ এবং জনগণের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ—দুই-ই অপরিহার্য। সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করা।
গণতন্ত্র একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্চা ও ধৈর্যের ফল। শক্তিশালী, নীতিনিষ্ঠ প্রতিপক্ষ রাজনীতি ছাড়া সেই চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং গণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। রাজনীতি যেন জনগণের জন্য হয়, ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নয়—এমনটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
# লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী
কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ
মোবাইল: ০১৮৭২৭৮৭৭৯৭

