শিক্ষকের অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতায় প্রতিবাদে ও স্থায়ী বদলীর দাবীতে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২ দিন ধরে শিক্ষার্থী শুন্য। এদিকে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ছুটিতে পাঠানোয় শিক্ষা অফিসের প্রতি ক্ষুদ্ধ অভিভাবকরা।
কোটালীপাড়ার ৬ নং ঘাঘরকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক তপতি বাড়ৈর বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ দিয়েও কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষকের স্থায়ী বদলি না হওয়ায় এমন চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। সোমবার (১২ জানুয়ারী) সাড়ে ১১ টায় স্কুল থেকে সকল শিক্ষার্থীদের নিয়ে যায় অভিভাবকেরা। মঙ্গলবারও কোন শিক্ষার্থী আসেনি বিদ্যালয়ে। স্থায়ী বদলী না পওয়া পর্যন্ত সন্তানদেরকে আর স্কুল পাঠাবেননা বলে জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার ৬ নং ঘাঘরকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় একজন শিক্ষার্থীও বিদ্যালয়ে উপস্থিত নেই। যেখানে শিক্ষার আলো ছড়ানোর কথা, সেখানে এখন বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। একজন শিক্ষক থাকলেও আসেনি কোনো শিক্ষার্থী। স্কুল প্রাঙ্গনে জড়ো হয়ে আছেন অভিভাবকেরা।
অভিভাবকদের দাবি, ২০২০ সালে স্কুলে যোগদানের পর থেকেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন তপতী। সময়মতো ক্লাসে না আসা, ক্লাসে পড়ানোর পরিবর্তে মোবাইল ফোন চালানো এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক নির্যারতন, প্রতিবাদ করলে হুমকী ও হয়রানী দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। একাধিক দপ্তরে অভিযোগের পর তদন্ত হলেও এক মাসেও হয়নি স্থায়ী বদলি। সোমবার তোপের মুখে মৌখীকভাবে তপতীকে ডেপুটেশনে অন্য স্কুলে বদলী করা হলেও সেখানে যোগদান না করে ছুটি নিয়েছেন ২ দিনের। এতে আরো ক্ষুব্ধ হয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
অভিভাবক শাহাদাত গাজী অভিযোগ করে বলেন, আমরা বহুবার অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। উল্টো তিনি আমাদের ভয়ভীতি দেখান। তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের কথাও আমরা শুনেছি। তার কারণে এই স্কুলে ভালো কোন শিক্ষক এসেও থাকতে চায় না। আর সহ্য করা সম্ভব নয়—আমরা তার স্থায়ী বদলি চাই।
অভিভাবক হুমায়ারা বেগম বলেন, তপতী ম্যাডাম যোগদানের পর থেকেই স্কুলে অরাজকতা চলছে। তিনি নিয়মিত স্কুলে আসেন না, ক্লাস নেন না। নিজের ছোট সন্তানকে শ্রেণিকক্ষে এনে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করেন। ক্লাস চলাকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। আমরা এসব বিষয়ে কথা বললে তিনি আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও হুমকি দেন।
আরেক অভিভাবক শাহানাজ বেগম বলেন, আমরা শুনেছি, তিনি ঘুষ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাই বাধ্য হয়ে আমরা সবাই মিলে আমাদের সন্তানদের স্কুল থেকে নিয়ে গেছি। যতদিন তার স্থায়ী বদলি না হবে, ততদিন আমাদের সন্তানরা এ স্কুলে পড়বে না।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষা অফিসারেরা এ বিদ্যালয়ের দিকে কোন নজর দেয় না। পৌরসভার একটা প্রাচীন স্কুল এটি। ১৯৪৪ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হলেও নানা সমস্যা এখানে। অনেক স্কুলে ৩ তলা, ৪ তলা ভবন হলেও আমাদের এখানে ৩ কক্ষের একতলা ভবনে ১ টি অফিস কক্ষ আর ২ টি শ্রেণিকক্ষ। শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাত্র ২ টি কক্ষে ক্লাস হয়। তাও আবার একটি কক্ষের মাঝে টিন দিয়ে ২ টি শ্রেণিকক্ষ বানানো হয়েছে। এই দুরাবস্থার জন্য আমরা শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবী জানাই।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নমিতা মন্ডল বলেন, সোমবার অন্যান্য দিনের মতোই ক্লাস চলছিল। হঠাৎ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে অভিভাবকেরা এসে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে নিয়ে যান। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানাই। তিনি বিদ্যালয়ে এসে অভিভাবকদের বুঝিয়ে বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে আসেন এবং তপতী বাড়ৈকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। আজ (মঙ্গলবার) সকালে তপতী ছুটির আবেদন পাঠান তার মেয়েকে দিয়ে। আমি শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালে তিনি ছুটি মঞ্জুর করতে বলেন। আমি ছুটি মঞ্জুর করে উপজেলায় মিটিংয়ে চলে আসি। পরে শুনি আজও কোন শিক্ষার্থী স্কুলে আসে নাই। বিষয়টি আমি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক তপতী বাড়ৈকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্ত বলেন, তপতী বাড়ৈর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। তাকে লোহারঙ্ক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৌখিকভাবে ডেপুটেশনে যোগ দিতে বলেছি।

